সব লেখাব্যবস্থাপনা

অভিভাবকের সাথে শিক্ষার্থীর অগ্রগতি নিয়ে কথা বলার কাঠামো

অভিভাবকের সাথে শিক্ষার্থীর অগ্রগতি নিয়ে কথা বলার চার ধাপের কাঠামো, প্রগ্রেস রিপোর্টে যা থাকা উচিত, আর গবেষণায় প্রমাণিত এক বাক্যের বার্তার প্রভাব।

ফা

ফারিয়া হক

৪ মিনিট পড়া

বেশিরভাগ অভিভাবক মিটিং একই রকমভাবে শেষ হয়। শিক্ষক বলেন ছেলেটা ভালো, একটু মনোযোগ দিলে আরও ভালো করবে। অভিভাবক মাথা নাড়েন, ধন্যবাদ দিয়ে চলে যান, এবং বাড়ি ফিরে ঠিক কী করবেন তা জানেন না। দুই পক্ষই সন্তুষ্ট, কিন্তু শিক্ষার্থীর কিছুই বদলায় না।

সমস্যাটা আন্তরিকতার নয়, কাঠামোর। অভিভাবকের সাথে শিক্ষার্থীর অগ্রগতি নিয়ে কথা বলার একটি নির্দিষ্ট কাঠামো থাকলে একই দশ মিনিটের আলোচনা থেকে বাস্তব ফল আসে, এবং গবেষণায় সেই ফল মাপা হয়েছে।

যোগাযোগের প্রভাব আসলে কতটা

দুটি পরীক্ষামূলক গবেষণা এই প্রশ্নের উত্তর দেয়।

প্রথমটিতে ৪৩৫ জন শিক্ষার্থীর অভিভাবককে চার সপ্তাহ ধরে সপ্তাহে একটি করে এক বাক্যের বার্তা পাঠানো হয়েছিল। বার্তাগুলোর গড় দৈর্ঘ্য ছিল মাত্র ৮.৭ শব্দ। এতেই কোর্স শেষ করতে ব্যর্থ হওয়ার হার ৪১ শতাংশ কমে যায়।

আরও গুরুত্বপূর্ণ ছিল বার্তার ধরন। যেসব বার্তায় শিক্ষার্থীর কোন জায়গাটা উন্নতি করা দরকার তা বলা ছিল, সেগুলো প্রশংসার বার্তার চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ কার্যকর হয়েছিল। কারণটাও পরিষ্কার: উন্নতির বার্তাগুলোর ৮৪ শতাংশ ছিল এমন যে অভিভাবক সেটা নিয়ে কিছু করতে পারেন, আর প্রশংসার বার্তার ক্ষেত্রে এই হার ছিল মাত্র ৮.৫ শতাংশ।

দ্বিতীয় গবেষণায় ১৪০ জন শিক্ষার্থীর অভিভাবককে এক সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন ফোন বা বার্তা করা হয়েছিল। ফল হলো, বাড়ির কাজ সময়মতো ও সম্পূর্ণ জমা দেওয়ার odds ১.৪ গুণ হয়েছিল, অর্থাৎ ৪০ শতাংশ বেশি, ক্লাসে অংশগ্রহণ ১৫ শতাংশ বেড়েছিল, এবং ক্লাসে শিক্ষার্থীকে বারবার মনোযোগ ফেরাতে বলার প্রয়োজন ২৫ শতাংশ কমেছিল।

এক বাক্যের বার্তা এতটা কাজ করার কারণ সম্ভবত এই যে, বেশিরভাগ অভিভাবক জানেনই না তাদের সন্তান ক্লাসে ঠিক কোথায় দাঁড়িয়ে আছে। তথ্যের অভাবটুকু পূরণ হলেই আচরণ বদলায়।

এর সঙ্গে মেলে আরও বড় একটি পর্যালোচনা, যেখানে মাধ্যমিক পর্যায়ের বহু গবেষণা একসঙ্গে বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অভিভাবকের সম্পৃক্ততার সঙ্গে শিক্ষার্থীর ফলাফলের সম্পর্ক ধারাবাহিকভাবে ইতিবাচক। অর্থাৎ অভিভাবককে যুক্ত রাখা আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি ফলাফলের একটি উপাদান।

দশ মিনিটের আলোচনার চারটি ধাপ

কাঠামোটি ছোট এবং প্রতিটি অভিভাবকের জন্য একই।

প্রথম ধাপে তথ্য দিন, বিশেষণ নয়। "ভালো করছে" বা "মনোযোগ কম" কোনো তথ্য নয়। "গত তিন পরীক্ষায় গণিতে ৬২, ৫৮ এবং ৭১ পেয়েছে, আর জ্যামিতির অংশেই নম্বর কম যাচ্ছে" তথ্য। অভিভাবক দ্বিতীয়টি নিয়ে কিছু করতে পারেন।

দ্বিতীয় ধাপে একটি বিষয় বেছে নিন, তিনটি নয়। একসঙ্গে অনেকগুলো সমস্যা বললে অভিভাবক কোনোটিতেই হাত দেন না। যেটি সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলবে, সেটি একটিই বলুন।

তৃতীয় ধাপে বাড়িতে করণীয় একটি নির্দিষ্ট কাজ দিন। "একটু খেয়াল রাখবেন" কাজ নয়। "প্রতিদিন রাতে জ্যামিতির দুইটা অঙ্ক করাবেন, ১৫ মিনিট লাগবে" কাজ। যত নির্দিষ্ট, তত বেশি সম্ভাবনা যে কাজটি হবে।

চতুর্থ ধাপে পরের যোগাযোগের তারিখ ঠিক করুন। "তিন সপ্তাহ পরে আমি জানাব জ্যামিতির নম্বর বদলালো কি না।" এই এক লাইন পুরো আলোচনাকে প্রতিশ্রুতিতে বদলে দেয়, এবং অভিভাবক জানেন কেউ ফলোআপ করবে।

প্রগ্রেস রিপোর্টে যা থাকা উচিত

প্রগ্রেস রিপোর্ট হোক ছোট: প্রতিটি বিষয়ে শিক্ষার্থী কোথায় আছে, আর পরের ধাপ কী।

বেশিরভাগ প্রগ্রেস রিপোর্ট আসলে নম্বরের তালিকা। নম্বর নিজে কিছু বলে না, প্রবণতা বলে।

উপস্থিতির হার রাখুন, সংখ্যায়। অনিয়মিত উপস্থিতি প্রায় সব সমস্যার প্রথম লক্ষণ, এবং এটি অভিভাবকের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে থাকা একমাত্র বিষয়।

একটি নম্বর নয়, তিনটি পরীক্ষার নম্বর পাশাপাশি রাখুন। ৭০ নম্বরটি ভালো না খারাপ, সেটি বোঝা যায় আগের দুটি নম্বর দেখলে।

তুলনা করুন শিক্ষার্থীর নিজের আগের ফলের সঙ্গে, ক্লাসের অন্যদের সঙ্গে নয়। ক্লাসে রোল বা র‍্যাঙ্ক দিয়ে তুলনা করলে দুর্বল শিক্ষার্থীর অভিভাবক লজ্জা পান, এবং লজ্জা কোনো পদক্ষেপ তৈরি করে না।

বিষয়ভিত্তিক মন্তব্য রাখুন, কিন্তু নির্দিষ্ট করে। "ইংরেজিতে দুর্বল" নয়, "প্যারাগ্রাফ লিখতে পারে, কিন্তু grammar-এর tense অংশে ভুল বেশি"।

সবশেষে একটি কাজ। প্রতিটি রিপোর্টে অভিভাবকের জন্য ঠিক একটি করণীয় থাকলে রিপোর্টটি কাগজ থেকে কাজে রূপ নেয়।

যেসব অভ্যাস কাজ নষ্ট করে

শুধু সমস্যা হলে ফোন করা। যদি আপনার নম্বর দেখলেই অভিভাবক ধরে নেন খারাপ খবর আসছে, তাহলে তিনি ফোন ধরা কমিয়ে দেবেন। মাঝেমধ্যে ভালো খবরও দিন, তবে ভালো খবরটিও নির্দিষ্ট রাখুন।

একসঙ্গে অনেক তথ্য দেওয়া। দশ মিনিটে তিনটি বিষয়ের সাতটি সমস্যা বললে অভিভাবক কিছুই মনে রাখেন না।

বাড়ির পরিস্থিতি নিয়ে অনুমান করা। কোন বাড়িতে পড়ার জায়গা আছে, কে সময় দিতে পারেন, কার ইন্টারনেট আছে, এগুলো জানার একটাই উপায়, জিজ্ঞাসা করা।

সব কথা মুখে বলে শেষ করা। আলোচনার পর এক লাইনের একটি বার্তা পাঠান যাতে সিদ্ধান্তটা লেখা থাকে। মুখের কথা এক সপ্তাহে হারিয়ে যায়, লেখা থাকে।

একটি বাস্তব যোগাযোগের রুটিন

প্রতিদিন প্রতিটি অভিভাবককে ফোন করা কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু গবেষণার মূল শিক্ষা ছিল নিয়মিততা আর নির্দিষ্টতা, দৈর্ঘ্য নয়। ছোট প্রতিষ্ঠানের জন্য এই রুটিনটি চালানো যায়।

সপ্তাহে একবার এক লাইনের বার্তা, শুধু সেসব শিক্ষার্থীর অভিভাবককে যাদের উপস্থিতি বা জমা দেওয়া কাজে ঘাটতি আছে। এক লাইনই যথেষ্ট, গবেষণায় গড় দৈর্ঘ্য ছিল নয় শব্দের কম।

মাসে একবার প্রগ্রেস রিপোর্ট, সবার জন্য, উপস্থিতি ও তিন পরীক্ষার নম্বরসহ।

তিন মাসে একবার সরাসরি বা ফোনে দশ মিনিটের আলোচনা, উপরের চার ধাপে।

আর যেকোনো সময়, যখন কিছু ভালো ঘটেছে, তখন সেই মুহূর্তেই একটি বার্তা। এই বার্তাগুলোই পরে কঠিন আলোচনাগুলো সহজ করে দেয়।

খারাপ খবর দেওয়ার নিয়ম

কিছু আলোচনা কঠিন, এবং সেগুলো এড়ানো গেলে সমস্যা বড় হয়।

তিনটি জিনিস কাজে দেয়। ঘটনাটা বলুন, ব্যাখ্যা বা বিচার ছাড়া। এরপর বলুন প্রতিষ্ঠান কী করছে। তারপর বলুন অভিভাবকের কাছ থেকে কী প্রয়োজন। এই ক্রমে বললে অভিভাবক আত্মরক্ষায় যান না, কারণ তিনি দেখেন সমাধানের দায় ভাগ করা হচ্ছে।

আর যেটা করবেন না, তা হলো অন্য শিক্ষার্থীর উদাহরণ টানা। তুলনা কখনো সাহায্য করে না।

সারসংক্ষেপ

এক বাক্যের নির্দিষ্ট বার্তা লম্বা অস্পষ্ট আলোচনার চেয়ে বেশি কাজ করে, এবং গবেষণায় এর প্রমাণ আছে। তথ্য দিন, একটি বিষয় বেছে নিন, বাড়িতে করার একটি কাজ দিন, আর পরের যোগাযোগের তারিখ বলে দিন। প্রশংসা ভালো, কিন্তু প্রশংসা দিয়ে অভিভাবক কিছু করতে পারেন না।

তথ্যসূত্র

Kraft, M. A., and Rogers, T. (2015). The underutilized potential of teacher-to-parent communication: Evidence from a field experiment. Economics of Education Review, 47, 49-63. https://doi.org/10.1016/j.econedurev.2015.04.001

Kraft, M. A., and Dougherty, S. M. (2013). The Effect of Teacher-Family Communication on Student Engagement: Evidence From a Randomized Field Experiment. Journal of Research on Educational Effectiveness, 6(3), 199-222. https://eric.ed.gov/?id=EJ1164707

Jeynes, W. H. (2007). The Relationship Between Parental Involvement and Urban Secondary School Student Academic Achievement: A Meta-Analysis. Urban Education, 42(1), 82-110. https://doi.org/10.1177/0042085906293818

আরও পড়ুন

আপনার প্রতিষ্ঠানে এটা কেমন দেখাবে?

১৫ মিনিটের একটা ডেমোতে নিজের ব্যাচ, হাজিরা আর ফি-এর হিসাব দিয়ে দেখে নিন।

WhatsApp-এ কথা বলুন
WhatsApp